ঢাকা ০৮:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সংবাদ বিজ্ঞপ্তী ::
সাপ্তাহিক যায় সময় পক্ষ থেকে লেখা আহবান

মনুর ঈদ যাপন (গল্প)

  • আপডেট সময় : ১০:০০:১৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪
  • / ৬৫ বার পড়া হয়েছে

মনুর ঈদ যাপন (গল্প)

কনক কুমার প্রামানিক

 

মনু একজন পথশিশু। যদিও আজকাল এ শব্দটি বেশীরভাগ মানুষই ব্যবহার করেনা। ওদেরকে টোকাই বলেই ডাকে। রাস্তায় ওদের সবকিছু। রাস্তায় বাড়িঘর, রাস্তায় কাজের জায়গা। দিনের বেলা মনু ডাস্টবিনের মধ্যে পরিত্যক্ত বোতল, প্লাস্টিক আর ভাঙাচোরা এটা-সেটা খুঁজে বেড়ায়। আর রাত হলে ওর মতো আর কয়েকজন ঠোকাই একসঙ্গে রাস্তার পাশে, বাসস্টপেজ আবার কখনো রেল স্টেশনে ঘুমায়। ঘুম ঠিক নয়। মাথাগুজে পড়ে থাকে। সবসময়ই  ওদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করে। কখনো রাস্তার পাশে বেপরোয়া গাড়িগুলো ওদের উপরে উঠে আসে আবার কখনো পুলিশের ঠ্যাঙানি। তাছাড়া ঝড়-বৃষ্টি তো আছেই। তিব্র শীতে ওরা ঠক ঠক করে কাঁপে। কেউ ওদের দিকে ফিরে তাকায় না। অবাঞ্ছিত যেন উটকো ঝামেলা।
মনুর সঙ্গে আছে বুলেট, কালা, আজিম, হোচেন, বাবু, হাচান, নয়ন, হাবু, লজেন আর মনু। ওদের মধ্যে মনু সবচেয়ে ছোট। দশ বারো বছরের হবে। ওদের ধর্ম কী? কবে, কখন কোথায় থেকে ওরা এসেছে তা ওরা কেউ জানে না। যারা এখানে বড়, শক্তি সামর্থ্য বেশী তাদের দাপটও এখানে বেশী।
বেশ কিছুদিন হলো খুব গরম বেড়েছে। দিনের বেলা রাস্তাঘাটে চলা যেমন দূর্দায় রাতেও তেমনি একটাও গাছের পাতা নড়ে না। গরমে দম বেরিয়ে যাবার অবস্থা। তাই আজকাল ওরা ঠাঁই নিয়েছে বড় বস্তিটার ওপারে যেখানে একটা বড় মাঠ আছে। মাঠে কিছু বড় বড় সাইজের পাইপ রাখা আছে সেখানে। রাতে ওরা সে পাইপগুলোর মধ্যে ঘুমায়।
রাজধানীতে আজকাল পথশিশুদের আনাগোনা বেজায় বেড়েছে। মানুষের লাথি-গুতা, অবহেলা অবজ্ঞায় ওদের দিন কাটে। সমাজে কেউ ওদের ভালো নজরে দেখে না। ওরা যেন সমাজের কীট ভাসমান শ্যাওলা আর্বজনা।
ইদানিং মানুষের মূল্যবোধের বড় অবক্ষয় হয়েছে। মানুষের মাঝে আন্তরিকতার বড় অভাব। যার ফল স্বরুপ পথশিশু বা টোকাইদের দৌরাত্ম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওরা বেশ কিছু গ্যাং তৈরি করেছে। দিনের বেলা এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। রাত হলে সংঘবদ্ধ হয়ে চুরি ছিনতাই করে। এদের জ্বালায় সন্ধ্যার পরে সাধারণ মানুষজনের চলাফেরা দূর্দায় হয়ে পড়েছে। খুন-জখম বেড়েছে। রাজধানীতে এই গ্যাং গুলো অত্যন্ত সক্রিয়।
মনুদের দলের বুলেটের নেতৃত্ব এ রকম একটি সক্রিয় গ্যাং রয়েছে। ওরা চুরি, ছিনতাইসহ নানা রকম অপকর্ম করে বেড়ায়। দিনকে দিন অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে ওরা। খুব দূর্ধষ ।
মনু ওদের দলে যোগ দিয়ে এসব অপকর্ম করতে চায় না। সেজন্য দলের অন্য সদস্যদের হাতে প্রায়শঃ মার খেতে হয় তাকে। সন্ধ্যার সময়টাতে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায় মনু। ওসব করতে ওর একদম ভালো লাগে না।
ঈদের আর সপ্তাহখানেক বাঁকী আছে। এ সময় রাস্তাঘাটে লোকজনের চলাচল বেশী থাকে। রাতে একটা জরুরী মিটিং ডাকে বুলেট। ঈদটা ভালোভাবে কাটাতে ওদের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। সবাই তার কথায় সম্মতি দেয়। মনু আপত্তি জানায়। তাই ওকে দল থেকে বের করে দেয়া হয়। কাল থেকে সে আর এখানে ওদের সাথে থাকতে পারবে না। কাল দিনের মধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে মনুকে। দূঃচিন্তায় নির্ঘুম কাটে রাতটা। কি করবে, কোথায় যাবে কিছুই বুঝতে পারে না।
সকালবেলা ওঠে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে হাঁটতে থাকে । হাঁটতে হাঁটতে কমলাপুর রেল স্টেশনে চলে আসে সে। জায়গাটা এখন লোকে লোকারণ্য। পা ফেলার জায়গা নাই। ট্রেনের ছাদে অনেক লোক বাড়ি যাচ্ছে। ঈদের ছুটিতে। পরিবার পরিজনের সঙ্গে ঈদ করার জন্য। মনু কোন চিন্তা ভাবনা না করে একটা ট্রেনে উঠে পড়ে। উত্তরবঙ্গগামী ট্রেন। যেতে যেতে একটা সময় ঘুমিয়ে পড়ে সে। ঘুম ভাঙতেই সে দেখে সমস্ত ট্রেন ফাঁকা। কোন লোকজন নাই। সবাই নেমে পড়েছে। শেষ স্টেশন ছিল ওটা।
হুমমুড় করে ট্রেন থেকে নেমে পড়ে সে। স্টেশনের একটা বেঞ্চিতে বসে খুব মন খারাপ করে কাঁদতে থাকে। তার যে আর কোথাও যাবার উপায় নাই। পৃথিবীতে তার কেউ নাই। সে একা। বড় একা। হঠাৎ মনু পিঠে একটা হাতের ছোঁয়া অনুভব করে। স্টেশনের ফেরিওয়ালা কফিল মিয়া। সারাদিন স্টেশনে ফেরি করে এটা সেটা বিক্রি করেন। মনুকে এ অবস্থায় দেখে তার পাশে এগিয়ে আসেন। তার মুখ থেকে সব কথা শোনেন। খুব মায়া হয় মনুর প্রতি।
স্টেশনের পাশেই কফিল মিয়ার বাড়ি। সঙ্গে করে নিয়ে আসেন মনুকে। মনু সম্পর্কে সব কিছু শোনার পর কফিল মিয়ার স্ত্রী বুকে জড়িয়ে ধরে তাকে। খুশিতে তিন জনের চোখে জল আসে। কফিল মিয়ার ষোল বছরের সংসারে যে কোন ছেলে মেয়ে নাই। মনুকে পেয়ে খুব খুশি হয় নিঃসন্তান এ দম্পতি। মনুও খুব খুশি। পূনজন্ম হয়েছে যেন তার। মনুকে একটা স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে কফিল মিয়া। পিতার জায়গায় তার ও মাতার জায়গায় তার স্ত্রীর নাম দিয়েছে। বিকেলে ঈদের কেনাকাটা করতে যায় ওরা। মনুকে অনেকগুলো জামাকাপড় কিনে দেন কফিল মিয়া ও তার স্ত্রী। সাথে সুন্দর একটা পাঞ্জাবী।
রাতে এসে একসঙ্গে খেতে বসে তিনজন। পরম মমতায় মাছের মাথাটা মনুর পাতে তুলে দেয় কফিল মিয়ার স্ত্রী। খুশিতে দু’চোখ চিকচিক করে ওঠে মনুর। কোনদিন এতো আদর করে ভালোমন্দ খাবার কেউ তাকে খাওয়াইনি। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কফিল মিয়া ও মনু নতুন পাঞ্জাবী পড়ে ঈদের নামাজ পড়তে যায়।
মহাদেবপুর, নওগাঁ, বাংলাদেশ।
মুঠোফোন- +৮৮০১৭২৩১৪৯৬৪৪।
ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

মনুর ঈদ যাপন (গল্প)

আপডেট সময় : ১০:০০:১৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪

মনুর ঈদ যাপন (গল্প)

কনক কুমার প্রামানিক

 

মনু একজন পথশিশু। যদিও আজকাল এ শব্দটি বেশীরভাগ মানুষই ব্যবহার করেনা। ওদেরকে টোকাই বলেই ডাকে। রাস্তায় ওদের সবকিছু। রাস্তায় বাড়িঘর, রাস্তায় কাজের জায়গা। দিনের বেলা মনু ডাস্টবিনের মধ্যে পরিত্যক্ত বোতল, প্লাস্টিক আর ভাঙাচোরা এটা-সেটা খুঁজে বেড়ায়। আর রাত হলে ওর মতো আর কয়েকজন ঠোকাই একসঙ্গে রাস্তার পাশে, বাসস্টপেজ আবার কখনো রেল স্টেশনে ঘুমায়। ঘুম ঠিক নয়। মাথাগুজে পড়ে থাকে। সবসময়ই  ওদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করে। কখনো রাস্তার পাশে বেপরোয়া গাড়িগুলো ওদের উপরে উঠে আসে আবার কখনো পুলিশের ঠ্যাঙানি। তাছাড়া ঝড়-বৃষ্টি তো আছেই। তিব্র শীতে ওরা ঠক ঠক করে কাঁপে। কেউ ওদের দিকে ফিরে তাকায় না। অবাঞ্ছিত যেন উটকো ঝামেলা।
মনুর সঙ্গে আছে বুলেট, কালা, আজিম, হোচেন, বাবু, হাচান, নয়ন, হাবু, লজেন আর মনু। ওদের মধ্যে মনু সবচেয়ে ছোট। দশ বারো বছরের হবে। ওদের ধর্ম কী? কবে, কখন কোথায় থেকে ওরা এসেছে তা ওরা কেউ জানে না। যারা এখানে বড়, শক্তি সামর্থ্য বেশী তাদের দাপটও এখানে বেশী।
বেশ কিছুদিন হলো খুব গরম বেড়েছে। দিনের বেলা রাস্তাঘাটে চলা যেমন দূর্দায় রাতেও তেমনি একটাও গাছের পাতা নড়ে না। গরমে দম বেরিয়ে যাবার অবস্থা। তাই আজকাল ওরা ঠাঁই নিয়েছে বড় বস্তিটার ওপারে যেখানে একটা বড় মাঠ আছে। মাঠে কিছু বড় বড় সাইজের পাইপ রাখা আছে সেখানে। রাতে ওরা সে পাইপগুলোর মধ্যে ঘুমায়।
রাজধানীতে আজকাল পথশিশুদের আনাগোনা বেজায় বেড়েছে। মানুষের লাথি-গুতা, অবহেলা অবজ্ঞায় ওদের দিন কাটে। সমাজে কেউ ওদের ভালো নজরে দেখে না। ওরা যেন সমাজের কীট ভাসমান শ্যাওলা আর্বজনা।
ইদানিং মানুষের মূল্যবোধের বড় অবক্ষয় হয়েছে। মানুষের মাঝে আন্তরিকতার বড় অভাব। যার ফল স্বরুপ পথশিশু বা টোকাইদের দৌরাত্ম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওরা বেশ কিছু গ্যাং তৈরি করেছে। দিনের বেলা এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। রাত হলে সংঘবদ্ধ হয়ে চুরি ছিনতাই করে। এদের জ্বালায় সন্ধ্যার পরে সাধারণ মানুষজনের চলাফেরা দূর্দায় হয়ে পড়েছে। খুন-জখম বেড়েছে। রাজধানীতে এই গ্যাং গুলো অত্যন্ত সক্রিয়।
মনুদের দলের বুলেটের নেতৃত্ব এ রকম একটি সক্রিয় গ্যাং রয়েছে। ওরা চুরি, ছিনতাইসহ নানা রকম অপকর্ম করে বেড়ায়। দিনকে দিন অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে ওরা। খুব দূর্ধষ ।
মনু ওদের দলে যোগ দিয়ে এসব অপকর্ম করতে চায় না। সেজন্য দলের অন্য সদস্যদের হাতে প্রায়শঃ মার খেতে হয় তাকে। সন্ধ্যার সময়টাতে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায় মনু। ওসব করতে ওর একদম ভালো লাগে না।
ঈদের আর সপ্তাহখানেক বাঁকী আছে। এ সময় রাস্তাঘাটে লোকজনের চলাচল বেশী থাকে। রাতে একটা জরুরী মিটিং ডাকে বুলেট। ঈদটা ভালোভাবে কাটাতে ওদের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। সবাই তার কথায় সম্মতি দেয়। মনু আপত্তি জানায়। তাই ওকে দল থেকে বের করে দেয়া হয়। কাল থেকে সে আর এখানে ওদের সাথে থাকতে পারবে না। কাল দিনের মধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে মনুকে। দূঃচিন্তায় নির্ঘুম কাটে রাতটা। কি করবে, কোথায় যাবে কিছুই বুঝতে পারে না।
সকালবেলা ওঠে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে হাঁটতে থাকে । হাঁটতে হাঁটতে কমলাপুর রেল স্টেশনে চলে আসে সে। জায়গাটা এখন লোকে লোকারণ্য। পা ফেলার জায়গা নাই। ট্রেনের ছাদে অনেক লোক বাড়ি যাচ্ছে। ঈদের ছুটিতে। পরিবার পরিজনের সঙ্গে ঈদ করার জন্য। মনু কোন চিন্তা ভাবনা না করে একটা ট্রেনে উঠে পড়ে। উত্তরবঙ্গগামী ট্রেন। যেতে যেতে একটা সময় ঘুমিয়ে পড়ে সে। ঘুম ভাঙতেই সে দেখে সমস্ত ট্রেন ফাঁকা। কোন লোকজন নাই। সবাই নেমে পড়েছে। শেষ স্টেশন ছিল ওটা।
হুমমুড় করে ট্রেন থেকে নেমে পড়ে সে। স্টেশনের একটা বেঞ্চিতে বসে খুব মন খারাপ করে কাঁদতে থাকে। তার যে আর কোথাও যাবার উপায় নাই। পৃথিবীতে তার কেউ নাই। সে একা। বড় একা। হঠাৎ মনু পিঠে একটা হাতের ছোঁয়া অনুভব করে। স্টেশনের ফেরিওয়ালা কফিল মিয়া। সারাদিন স্টেশনে ফেরি করে এটা সেটা বিক্রি করেন। মনুকে এ অবস্থায় দেখে তার পাশে এগিয়ে আসেন। তার মুখ থেকে সব কথা শোনেন। খুব মায়া হয় মনুর প্রতি।
স্টেশনের পাশেই কফিল মিয়ার বাড়ি। সঙ্গে করে নিয়ে আসেন মনুকে। মনু সম্পর্কে সব কিছু শোনার পর কফিল মিয়ার স্ত্রী বুকে জড়িয়ে ধরে তাকে। খুশিতে তিন জনের চোখে জল আসে। কফিল মিয়ার ষোল বছরের সংসারে যে কোন ছেলে মেয়ে নাই। মনুকে পেয়ে খুব খুশি হয় নিঃসন্তান এ দম্পতি। মনুও খুব খুশি। পূনজন্ম হয়েছে যেন তার। মনুকে একটা স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে কফিল মিয়া। পিতার জায়গায় তার ও মাতার জায়গায় তার স্ত্রীর নাম দিয়েছে। বিকেলে ঈদের কেনাকাটা করতে যায় ওরা। মনুকে অনেকগুলো জামাকাপড় কিনে দেন কফিল মিয়া ও তার স্ত্রী। সাথে সুন্দর একটা পাঞ্জাবী।
রাতে এসে একসঙ্গে খেতে বসে তিনজন। পরম মমতায় মাছের মাথাটা মনুর পাতে তুলে দেয় কফিল মিয়ার স্ত্রী। খুশিতে দু’চোখ চিকচিক করে ওঠে মনুর। কোনদিন এতো আদর করে ভালোমন্দ খাবার কেউ তাকে খাওয়াইনি। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কফিল মিয়া ও মনু নতুন পাঞ্জাবী পড়ে ঈদের নামাজ পড়তে যায়।
মহাদেবপুর, নওগাঁ, বাংলাদেশ।
মুঠোফোন- +৮৮০১৭২৩১৪৯৬৪৪।