তৃপ্তির হাসি


jaisomoy প্রকাশের সময় : অক্টোবর ৯, ২০২২, ৫:৪৯ অপরাহ্ন /
তৃপ্তির হাসি
নিজের জন্মদাত্রী মা’কে এভাবে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে হবে কখনো কল্পনাও করেনি অনন্যা। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে এই মানুষটার আঁচলের ছায়ায় থেকেই বড় হয়েছে। জীবনযুদ্ধে উনি একাই লড়াই করে বড় করেছে অনন্যাকে। তার মা তাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করলেও কেন যেন আজ নিজেকে বড্ড অমানুষ মনে হচ্ছে অনন্যার কাছে।
বয়স বেড়েছে শরীরেও আগের মতো শক্তি নেই একা একা কিভাবে থাকবে তার অসুস্থ মা!! এই চিন্তা করেই নিজের মা’কে নিয়ে এসেছিল স্বামীর বাড়িতে। তবে অনন্যা নিজেই চাকরি করে তার মা’র ভরনপোষণ আর চিকিৎসা করতো। তবুও শাশুড়ীর তিক্ত কথা আর অপমানের থেকে একদিনও রেহাই পায়নি অনন্যা। দিন দিন এই তিক্ত কথা গুলা তার মা’য়ের কানেও পৌঁছাতে লাগলো। তার মা’য়ের প্রতি অবহেলা যেন বেড়েই চলছে। অনন্যা অফিসে গেলেই শুরু হতো নানান অপমান আর অবহেলা। এইতো কাল সন্ধ্যা যখন অফিস থেকে অনন্যা ফিরেছে তখন তার শাশুড়ী চেচিয়ে চেচিয়ে বলেছেন-
—”এমন উটকো ঝামেলা এই বাসায় আর ভালো লাগে না। বুড়ো হয়েছে ওনাকে তো বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসলেই পারো।”
সেই মুহূর্তে কেন যেন অনন্যার কাছে মনে হয়েছিল তার মা’য়ের জন্য বৃদ্ধাশ্রমটা-ই শান্তির জায়গায় হবে। তা-ই এই অপমান থেকে নিজের মা’কে রক্ষা করতেই বাধ্য হয়ে রেখে আসলো বৃদ্ধাশ্রমে। তবে এতে তার মা’য়ের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অনন্যার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন-
—”কষ্ট পাস না অনন্য আমি তোর পরিস্থিতি বুঝতে পারছি। ক’দিনই বা মেয়ের সংসারে থাকবো বল!! তুই বরং সময় পেলেই আমাকে এখানে এসে দেখে যাস।”
অনন্যা কিছু বলতে পারেনি চোখের জল ফেলতে ফেলতে বেরিয়ে এসেছে রাস্তায়। চারপাশ অন্ধকার হয়ে তুমুল বেগে বৃষ্টি নেমেছে এই শহরের বুকে। আর এই বৃষ্টির মাঝেই নিজের কান্না লুকাচ্ছে অনন্যা।
————————
গভীর রাতে কারও ডুকরে ডুকরে কান্না করার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল আইয়ানের। পাশ ফিরে অনন্যাকে না পেয়ে চলে গেল পাশের রুমে। এখান থেকেই আসছে কান্নার শব্দ। দরজা খানিকটা খুলেই দেখলো জায়নামাজে বসে মোনাজাত তুলে কান্না করছে অনন্যা। হয়তো নিজের মা’য়ের সাথে করা এমন কাজের জন্য অনুতপ্ত। আইয়ান আর তার কাছে গেল না দরজার বাহির থেকেই চলে আসলো বেড রুমে।
“মা তোমাকে এখানে রাখা সম্ভব না। আমি এতো ঝামেলা আর সামলাতে পারছি না। অল্প বেতনের চাকরি করে তোমাদের ভরনপোষণ মেটাতে খুব কষ্ট হয় আমার।”
নিজের ছেলে আইয়ানের মুখ থেকে সকাল সকাল এমন কথা শুনে যেন আকাশ ভেঙে পরলো তার মাথায়। যে ছেলে কি-না তার মা’য়ের কথার উপরে কোনো কথাই বলতো না আজ তার মুখে এমন কথা যেন অবিশ্বাস্যকর কিছু মনে হচ্ছে।
—”আমার ভরনপোষণ মেটাতে তোর কষ্ট হয় আইয়ান?? এইকথা কিভাবে বললি বাবা?? ছোট থেকে তোকে এতো বড় করেছি কখনো তোর প্রতি একটুখানি বিরক্ত ও হইনি আর তুই আজ আমার ভরনপোষণ মেটাতে বিরক্ত!!”
আইয়ান কিছু বলছে না চুপ করে আছে। তার মা তাকে চুপ থাকতে দেখে আবারও বললো-
—”তোর বাবা মারা গেছে বছর খানেক হবে তুই ছাড়া তো এখন আমার আর কেউ নেই। এই বয়সে কোথায় যাবো আমি??”
আইয়ান যেন এই প্রশ্নটার অপেক্ষাতেই ছিল। তাই প্রশ্ন করার সাথে সাথেই ফটাফট বলে দিলো-
—”কোথায় আবার বৃদ্ধাশ্রমে। বুড়ো মানুষদের জন্য তো বৃদ্ধাশ্রম আছেই। গতকালই তো অনন্যর আম্মুকে রেখে আসলো তুমি না হয় ওনার সাথেই থেকো।”
আইয়ানের মুখ এমন কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল তার মা। কিছুটা সময় স্তব্ধ থেকে আচমকাই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলেন উনি। কান্না করতে করতে বললেন-
—”আমার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে আইয়ান। এমন পাপ কাজ আমি কিভাবে করলাম!! অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি আমি আইয়ান।”
এরকম আরও নানান কথা বলতে বলতে কান্না করছে আইয়ানের মা। আর আইয়ানের ঠোঁটের কোণে লেগে আছে এক তৃপ্তিময় হাসি।
———————
সকালে নামাজ শেষেই বেরিয়ে পরেছিল অনন্যা। গন্তব্য হলো তার মা’য়ের বৃদ্ধাশ্রম। অনন্যার পক্ষে এমন জঘন্যতম কাজ করা সম্ভব না। সে পারবে না তার মা’কে এই বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে রাখতে। শাশুড়ী তিক্ত কথা আর সংসার হারানো ভয়ে সে পারবে না তার মা নামক জান্নাতটাকে অবহেলা করতে। বৃদ্ধাশ্রমে এসেই অনন্যা ঝাপিয়ে পরলো তার মা’য়ের কোলে। ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠলো অনন্যা। তার মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো-
—”আমাকে মাফ করে দাও মা। তুমি আমার কাছেই থাকবে আজ থেকে। ওই বাড়িতে জায়গা হলে হবে না হলে নেই। দরকার হলে তোমাকে নিয়ে আমি আলাদা বাড়িতে থাকব। কিন্তু আমি তোমাকে এখানে রেখে যেতে পারবো না। আমাকে মাফ করে দিও মা।”
অনন্যার মা হাত বুলিয়ে দিচ্ছে অনন্যার মাথায়। চেহারাতে তার তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেছে। তার মেয়ে শুধু হাতে কলমে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষিত হয়নি একজন ভালো মানুষও হয়েছে, মনুষ্যত্ববোধ শিখেছে। সে একজন ভালো সন্তানের মা হয়েছে তৃপ্তির হাসিটা-ই তো হাসা উচিত একজন গর্বিত মা হতে পেরে।
সমাপ্ত…❤️
তৃপ্তির_হাসি