নীলা নামের মেয়েটি


jaisomoy প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২২, ৬:১০ অপরাহ্ন /
নীলা নামের মেয়েটি

নীলা নামের মেয়েটি

মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম
সকাল ১০টা বাজে। আসিফ ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের ইংরেজি পড়াচ্ছে। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে প্রভাষক হিসেবে স্হানীয় সরকারি কলেজে নিয়োগ পেয়ে সে আজ দু’বছর যাবত শিক্ষকতা করছে। এসময় দপ্তরি এসে জানায়, একজন ভদ্র মহিলা তার সাথে দেখা করতে চান। তাকে দর্শনার্থীদের রুমে বসার অনুরোধ জানিয়ে আসিফ ক্লাস শেষে দেখা করবে বলে জানায়। দপ্তরি চলে গেলে আসিফ ক্লাসের পড়ায় মনোনিবেশ করে।
ক্লাস শেষে আসিফ সরাসরি দর্শনার্থীদের রুমে গিয়ে দেখে একজন ভদ্র মহিলা জানালার দিকে মুখ করে বসে আছেন। পিছন থেকে তাকে চেনা যায়না। ভিতরে আসতে পারি? আসিফের কথায় ভদ্র মহিলা ওঠে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকায়। আসিফ তাকে দেখে চমকে ওঠে বলে, আরে নীলা না? হ্যাঁ আমি নীলা। আসিফ বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে দেখে নীলার চেহারা মলিন এবং বিধ্বস্ত। মাথার চুলগুলো উসকো খুসকো। পরনের শাড়িটিও অপরিচ্ছন্ন । চেহারায় আগের মতো জৌলুস আর লাবন্যতা নেই। প্রানচাঞ্চল্যে ভরপুর একটি মেয়ে কেমন যেন ঝিমিয়ে গেছে।
প্রায় দু’বছর পর দেখা। নীলাকে দেখে আসিফ অস্বস্তিবোধ করলেও তার বিমর্ষ চেহারা দেখে কিছুই বলে না। চেয়ার টেনে বসে জিজ্ঞেস করে, কেমন আছো। হঠাৎ এতদিন পরে কোথা থেকে এলে। বিবাহিত জীবন কেমন কাটছে। স্বামী কি করছে? আসিফের এতো প্রশ্নের উত্তরে নীলা কিছুক্ষন নীরব থেকে একটা দীর্ঘনি:শ্বাস ছেড়ে বলে, সে মোটেও ভালো নেই। তার বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। একবছর আগে স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর তার স্বামী আরেকটি মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করছে। নীলার কথা শুনে আসিফ খুব আফসোস করে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। আলাপের একপর্যায়ে নীলা জানতে চায় আসিফ বিয়ে করেছে কী না? আর হলো কই? বলে আসিফ গম্ভীর হয়ে যায়। বিয়ে না হওয়ার জন্য সে দায়ী। তাই পরিবেশ হালকা করার জন্য নীলা আসিফের মোবাইল নাম্বার নিয়ে বলে, আজ তাহলে আসি। সময় পেলে ফোন দিও। আমিও যোগাযোগ করব। আসিফ স্টেশনে গিয়ে নীলাকে ট্রেনে তুলে দেয়। ট্রেন ছাড়ার পর দৃষ্টি সীমার বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত নীলা আসিফের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। আসিফও হাত নেড়ে বিদায় জানায়। তাদের দুটি মন স্বপ্নের খেয়ায় ভেসে চলে অজানা পথে। ঝরা পাতার মতো তাদের সুখগুলো কাছে এসেও হারিয়ে গেছে আকাশের দূর নীলিমায়।
বাসায় ফিরে আসিফ কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারে না। তার মানসপটে বারবার নীলার অসহায় মুখখানা ভেসে আসে। যার চোখে শুধু বেদনার ছায়া। আসিফ অনেক রাত পর্যন্ত নীলার কথা ভেবেই চলে। তার ভাবনার যেন শেষ নেই। মনে পড়ে সে সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয় নিয়ে অনার্সে ভর্তি হয়েছে। প্রথমদিন ক্লাসে যাওয়ার পথে সিঁড়িতে অনিন্দ্য সুন্দর একটি মেয়ের সাথে ধাক্কা লেগে তার বই ও খাতা মাটিতে পড়ে যায়। স্যরি বলে সেগুলো তুলে মেয়েটির হাতে দিতেই সে মিষ্টি হেসে ধন্যবাদ জানিয়ে ক্লাসে যায়। আসিফও ক্লাসের পথে পা বাড়ায়। ক্লাসে গিয়ে আসিফ মেয়েটিকে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়। আরে ধাক্কা লাগা মেয়েটি তো তার ক্লাসেরই ছাত্রী। মেয়েটিও বিস্মিত হয়ে তাকে দেখতে থাকে।
মেয়েটি নজরকাড়া সুন্দরী। তাকালে চোখ ফেরানো যায়না। শুধু দেখতেই ইচ্ছে করে। মনে হয় বিধাতা যেন তাকে নিজ হাতে বানিয়েছেন। ক্লাসের ছেলেরা যেচে তার সাথে কথা বলার এবং আলাপের চেষ্টা করেই যায়। অনেকে সুযোগ না পেয়ে মন খারাপ করে বসে থাকে। আসিফ এসব কান্ড দেখে মনে মনে হাসে এবং কৌতুক অনুভব করে। মেয়েটি সবাইকে হতাশ ও হতবাক করে আসিফের কাছে এসে হাসিমুখে তার নাম নীলা বলে জানায়। আসিফও তার পরিচয় দেয়। নীলা আসিফের পাশে বসে। সেই যে শুরু। এরপরে ঘনিষ্ঠতা, ক্রমে ভালো লাগা, অবশেষে তা ভালোবাসায় রুপান্তরিত হয়। ক্লাস, লাইব্রেরি, মধুর ক্যান্টিন, টিএসসি ইত্যাদি সবজায়গাতেই তাদেরকে একত্রে দেখা যায়। ইতোমধ্যে তারা মানিকজোড় হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ সুপরিচিত হয়ে উঠে। পড়াশোনার পাশাপাশি ছুটির দিনে পার্ক, সিনেমা ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করে তাদের জীবনটাকে ছন্দময় করে তোলে। মনের অজান্তেই হয়ে যায় বাঁধনহারা। স্বপ্ন সাজাতে দু’জনাই হয়ে যায় একাকার। ঝিরিঝিরি হাওয়ায় জাগিয়ে নতুন আশা খুঁজে সুখের ঠিকানা।
এভাবে দু’জন দু’জনাকে গভীরভাবে ভালোবাসে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ সমাপ্ত করে। আসিফ বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে নির্বাচিত হয়ে একটি সরকারি কলেজের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে এবং কিছুদিনের মধ্যেই পারিবারিকভাবে নীলাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে মোতাবেক দুই পরিবারের আলোচনা সাপেক্ষে তাদের বিয়ের দিনও ঠিক হয়। আসিফ নীলার মতো সুন্দরী এবং শিক্ষিতা মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে পেয়ে নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করে। সব যখন ঠিকঠাকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। তখন একটি ঘটনায় আসিফের স্বপ্ন ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। জীবন আকাশে নেমে আসে কালো মেঘের আবরণ। নীলা আসিফ ও তার পরিবারকে হতাশ করে বিয়ের আগের রাতে এক ধনী ব্যবসায়ীর ছেলের সাথে পালিয়ে যেয়ে তাকে বিয়ে করে। নীলা আসিফের কাছে এসেও কেন জানি দূরে চলে যায়।
আসিফ কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারেনা যে নীলা এভাবে তার সাথে বেইমানি করবে। বিষয়টি নিয়ে গ্রামে প্রচুর আলোচনা ও সমালোচনা হতে থাকে । যার ফলে আসিফ বিব্রতকর ও অপমানজনক অবস্থার মধ্যে পড়ে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন এবং অপমানিত হয়। তার মন কেঁদে মরে অনেক বারতা নিয়ে। বুকের ভিতর বয়ে যায় বেদনার ঝড়। রাতে বিছানায় শুয়ে আসিফ নীলার কথা ভেবে হতাশ হয়ে চোখের পানি ফেলে। তাহলে নীলা এতদিন কী তার সাথে অভিনয় করেছে? আসিফ কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারেনা। নীলাকে একজন ছলনাময়ী হিসেবে ভাবে। নীলার এই ছলনা সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনা। দীর্ঘ মেয়াদি ছুটি নিয়ে মন খারাপ করে সারাদিন বাসায় বসে থাকে। প্রায় মাস খানেক পর সবকিছু ভুলে আসিফ পুনরায় কলেজে যাওয়া শুরু করে। পিতা- মাতা বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও তাকে রাজি করাতে পারেননা। আসিফও শিক্ষকতার কাজে ব্যস্ত থেকে নীলাকে ভুলতে চায়। আর তাইতো আজ কলেজে দুঃখের কথা শুনে ব্যথিত হলেও মন থেকে সে নীলাকে গ্রহণ করতে পারেনি। অশ্রুভরা চোখে ভেবেছে পৃথিবীটা যেন স্বপ্নহীন দুঃখে ভরা। তার স্বপ্নগুলো মেঘে ঢেকে শুধু কেঁদেই চলে। বেড়ে যায় বিরহের দুরত্ব সীমাহীনভাবে। স্মৃতিপটে ভেসে আসে শুধু রঙিন সোনালি দিনের অনেক কথা। যা ঝিলমিল শিশিরের স্বচ্ছ ফোঁটায় বয়ে আনে অনেক বেদনার উষ্ণশ্বাস। অবুঝ ব্যথার অমলিন প্রদীপ জ্বালিয়ে আসিফ হতাশ হয়ে ছুটে চলে অজানার পথে। বিরহের ব্যাথায় ব্যথিত হয়ে ভাবে শুধু আমরণ দুঃখের অনেক কথা।
একসপ্তাহ পর নীলা আসিফকে টেলিফোন করে ক্ষমা চেয়ে কেঁদে কেঁদে জানায়, ভুল করে সেদিন সে একজনের সাথে পালিয়ে তাকে বিয়ে করেছিল। বিয়ের কয়েকমাসের মধ্যে জানতে পারে এর আগেও তার স্বামীর দু’বার বিয়ে হয়েছিল। মাদকাসক্ত এবং নির্যাতনের কারণে সবাই তাকে ছেড়ে গেছে। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তাকে বিয়ে করে। স্বামীকে সংশোধনের জন্য সে অনেক চেষ্টা করে। কিন্তু সংশোধন না হয়ে তার মাদকাসক্তের মাত্রা দিন দিন বেড়ে যায়। নিষেধ সত্বেও তার স্বামী একাধিক মেয়ের সাথে গোপনে অবৈধ সম্পর্ক বজায় রাখে। একবছর আপ্রাণ চেষ্টা করেও সে তার স্বামীকে সৎপথে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। তাই তাকে ত্যাগ করে সে চলে এসেছে। কথা প্রসঙ্গে নীলা আসিফের বিয়ে না করার বিষয়ে জানতে চায়। আসিফ অনেকক্ষন নীরব থেকে আফসোস করে বলে, সে সুযোগ দিলে কোথায়? আমাকে ফাঁকি দিয়ে তুমি তো আরেকজনের হাত ধরে চলে গেলে। একথা শুনে নীলা নিজেকে অপরাধী ভাবে। আসিফকে নিয়ে তার হৃদয়ের স্বপ্নগুলো সবসময় একাকি আনমনে বেদনার চাদরে জড়িয়ে আসে ছায়া হয়ে। তার সুখগুলো হারিয়ে গেছে চির অজানায়। আশাগুলো নিরাশ হয়ে ভেসে গেছে দূর নীলিমায়। নীলার স্বপ্নগুলো উঁকি দিয়ে আশা হয়ে আবার দেখা দেয় তার হৃদয়ে।
এরপর থেকে সবসময় মোবাইলে আসিফের সাথে নীলার কথা হয়। দু’জনাই পুনরায় ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। নীলা আসিফের মাঝে তার হারিয়ে যাওয়া জীবনকে পুনরায় ফিরে পেতে চায়। দু’চোখে দেখে একরাশ রঙিন স্বপ্ন। তাইতো এক ছুটির দিনে সে সুন্দরভাবে সেজেগুজে আসিফের কাছে এসে তাকে নিয়ে বেড়াতে যায়। সারাক্ষণ সে গুন গুন করে গান গেয়ে পরিবেশকে খুবই মোহনীয় করে তোলে। তার অপরুপ সৌন্দর্য আর চোখ ধাঁধানো রুপের কারনে আশেপাশের সবাইকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে তুলছিল। আসিফও নীলার মাঝে খুঁজে পাচ্ছিল হারিয়ে যাওয়া সোনালি দিনগুলোকে। আসিফের সাথে মেলামেশার পর থেকে নীলা জীবনকে আবার নতুন করে ভাবতে শিখেছে, দেখতে শুরু করেছে আসিফের সাথে ঘর বাঁধার রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু বিধাতা মনে হয় অগোচরে হেসেছিলেন। কারণ দুপুরে একটি রেস্টুরেন্টে খাবার সময় নীলা যখন অনেক আশা নিয়ে আসিফকে বলে, সে তাকে জীবন সাথী হিসেবে পেতে চায়। তখন আসিফ অনেক্ষন নীরব থেকে না সূচক জবাব জানিয়ে বলে, নীলাকে বিয়ে করা এখন তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। আসিফের একথা শুনে নতুন করে দেখা নীলার স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে যায়। অনেক আকুতি-মিনতি করেও আসিফকে রাজী করাতে পারে না। অবশেষে বিফল মনোরথে দু’চোখে অশ্রু ঝরিয়ে নীলা ফিরে যায়। নতুনভাবে দেখা স্বপ্নগুলো শাণিত নদীর স্রোতে আবার ভেসে যায়। হৃদয়ের কথাগুলো অগোছালো হয়ে লুকিয়ে থাকে মনের বেদনাগুলো। সুখের ঠিকানা হারিয়ে ভেঙে যায় মনের রঙিন স্বপ্নগুলো। বেদনায় নিমগ্ন থেকে নির্বাক হয়ে ভাবে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা।
পরেরদিন দুপুরে কলেজে ক্লাস নেওয়ার সময় এক বন্ধুর কাছ থেকে মোবাইলে জানতে পারে, গত রাতে নীলা বিষপানে আত্মহত্যা করেছে। ক্লাস না নিয়ে আসিফ বাইরে এসে নির্বাক হয়ে ভাবে নীলা কী আত্মহত্যা করে তার ভুলের প্রায়শ্চিত্য করেছে? আসিফ ব্যথভরা দৃষ্টিতে আকাশ পানে তাকিয়ে ভাবে, সে কী নীলাকে ফিরিয়ে দিয়ে ভুল করেছে? এসময় তার চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু অজান্তেই গড়িয়ে পড়ে। আসিফ আর বিয়ে করেনা। সে নীলার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। কারণ এতকিছুর পর নীলাই তার জীবনের সদ্য ফোটা ফুল। যার সুগন্ধে সে বিমোহিত হয়ে থাকবে অনন্তকাল।
লেখক ও কলামিস্ট :